চ্যাম্পিয়ন্স লিগ না জেতা সেরা ১৫ ফুটবলার

২৪ মার্চ ২০২৩

চ্যাম্পিয়ন্স লিগ না জেতা সেরা ১৫ ফুটবলার

খেলোয়াড় শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে এখন ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়কেও বড় অর্জন ধরা হয়। তবে এমন অনেক কিংবদন্তি ফুটবলার আছেন, যাঁরা কখনও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতেননি। তাদের কেউ কেউ বিশ্বকাপ জিতেছেন, কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ছুঁতে পারেননি। এই লেখা সেই ১৫ ফুটবলার নিয়ে...

এরনান ক্রেসপো।  ছবি: সংগৃহীত ১৫. এরনান ক্রেসপো

আর্জেন্টিনার সর্বকালের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা এরনান ক্রেসপো। ইউরোপের সেরা কয়েকটি ক্লাবে খেলেছেন; এমনকি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালেও দুটি গোল করেছেন। কিন্তু সে শিরোপা জেতা হয়নি।

২০০৫ সালে ক্রেসপো এসি মিলানে। লিভারপুলের বিপক্ষে ৩-০ গোলে এগিয়েও শেষ পর্যন্ত হারতে হয়েছে। দুই বছর পর এসি মিলান জেতে চ্যাম্পিয়নস লিগ; ক্রেসপো ততদিনে চলে গেছেন ইন্টার মিলানে। আবার ২০১০ সালে যে ইন্টার হয় ইউরোপসেরা, তার আগের বছর ক্রেসপো বদল করেন ক্লাব। দুর্ভাগ্য আর কাকে বলে! 

সেস্ক ফাব্রেগাস।  ছবি: সংগৃহীত১৪. সেস্ক ফাব্রেগাস

সেস্ক ফাব্রেগাস আরেক দুর্ভাগা। চ্যাম্পিয়নস লিগে ১০০টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন। ২০০৬ সালে আর্সেনালের জার্সিতে হন রানার্সআপ। শৈশবের ক্লাব বার্সেলোনায় ফেরেন ফাব্রেগাস ২০১১ সালে; বার্সা তিন মৌসুমের মধ্যে দু’বার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর। এই মিডফিল্ডার নু ক্যাম্পে ছিলেন পরের তিন মৌসুম। চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা হয়নি। যে মৌসুমে বার্সা ছেড়ে চেলসিতে গেলেন, সে মৌসুমেই বার্সা আবার চ্যাম্পিয়ন। ভাগ্য!

গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা।  ছবি: সংগৃহীত১৩. গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা

আর্জেন্টিনার সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। তাঁরও জেতা হয়নি চ্যাম্পিয়নস লিগ। ক্যারিয়ারের স্বর্ণসময়টা সিরি ‘এ’-র মাঝারি সারির ক্লাব ফিওরেন্তিনায় থাকার কারণেই হয়তো-বা!

৩১ বছর বয়সে ফিওরেন্তিনা ছেড়ে রোমায় যোগ দেন বাতিস্তুতা। তাতে সিরি ‘এ’ শিরোপা জেতেন অবশেষে। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা হয়নি। বলা ভালো, সে সম্ভাবনাও জাগাতে পারেননি সেভাবে।

মাইকেল বালাক।  ছবি: সংগৃহীত ১২. মাইকেল বালাক

একটি দলের হয়ে রানার্সআপ তাও হয়তো মেনে নেয়া যায়। কিন্তু দুটি দলের হয়ে? মানাটা বড্ড কঠিন। মাইকেল বালাকের বেলায় হয়েছিল ঠিক সেটিই। চ্যাম্পিয়নস লিগে ২০০২ সালে বায়ের লেভারকুসেনের হয়ে রানার্সআপ হন। ছয় বছর পর চেলসির হয়েও একই হতাশা। স্পর্শের দূরত্ব থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগে দূরে হারিয়ে যাওয়া।

সঙ্গে যোগ করুন, প্রজন্মের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারের ২০০২ বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে রানার্সআপ হওয়াটা। কী কপাল বালাকের!

প্যাট্রিক ভিয়েরা।  ছবি: সংগৃহীত ১১. প্যাট্রিক ভিয়েরা

আরেক তুখোড় মিডফিল্ডার প্যাট্রিক ভিয়েরা বিশ্বকাপ জেতেন ফ্রান্সের জার্সিতে। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা হয়নি। আর্সেনালের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দলের অংশ হয়েও। এই আক্ষেপটা ভিয়েরার থাকারই কথা।

রুদ ফন নিস্তেলরয়।  ছবি: সংগৃহীত ১০. রুদ ফন নিস্তেলরয় 

চ্যাম্পিয়নস লিগে ৫৬ গোল তাঁর। অথচ রুদ ফন নিস্তলরয়ের স্পর্শ পায়নি কখনও ওই ট্রফি।

এমন নয় যে, বাতিস্তুতার মতো তুলনামূলক ‘ছোট দলে ক্যারিয়ার কাটিয়েছেন। বরং স্বর্ণসময়ে ছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে। কিন্তু ডাচ ফরোয়ার্ড নিস্তলরয় কখনও জিততে পারেননি চ্যাম্পিয়নস লিগ।

পাভেল নেদভেদ।  ছবি: সংগৃহীত ৯. পাভেল নেদভেদ

২০০৩ সালে ব্যালন ডি’অর জেতেন পাভেল নেদভেদ। বিশ্বসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়েছেন অথচ চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেননি।

ক্লাব জুভেন্টাসকে ফাইনালে তুলেছিলেন এই মিডফিল্ডার। সেখানে টাইব্রেকারে হারতে হয় এসি মিলানের কাছে। দুঃখের ব্যাপার হল, বহিষ্কারাদেশের কারণে সে ফাইনাল খেলতে পারেননি নেদভেদ। আর কখনও চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপার অত কাছাকাছি যেতে পারেননি চেক প্রজাতন্ত্রের এই মিডফিল্ড শিল্পী।

লিলিয়ান থুরাম।  ছবি: সংগৃহীত ৮. লিলিয়ান থুরাম

পাভেল নেদভেদের মতো লিলিয়ান থুরামও জুভেন্টাসের সেই রানার্সআপ দলের সদস্য। সর্বকালের অন্যতম সেরা রাইট ব্যাক হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাঁকে। জাতীয় দল ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ, ইউরো জিতেছেন। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছিলেন জুভেন্টাসের জার্সিতে ওই ২০০৩ সালে। জিততে পারেননি। 

ফ্রানচেসকো তত্তি।  ছবি: সংগৃহীত ৭. ফ্রানচেসকো তত্তি

এক ক্লাবেই এক জীবন। রোমা ও ফ্রানচেসকো তত্তির সম্পর্কটা অমনই। ইতালিয়ান ক্লাবটিতে পুরো ক্যারিয়ার কাটিয়েছেন এই প্লে-মেকার। জিতেছেন ইতালিয়ান লিগ, ইতালিয়ান কাপ, ইতালিয়ান সুপার কাপ। কেবল চ্যাম্পিয়নস লিগটাই জেতা হয়নি তত্তির। 

১৯৯৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে রোমার জার্সি গায়ে ওঠে। এরপর ২৪ বছরে ৭৮৬ ম্যাচ। চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের সম্ভাবনাও অবশ্য কখনও জাগাতে পারেনি রোমা। তবে ইতালির বিশ্বকাপজয়ী এ ফুটবলার তাঁর সামর্থ্যের কারণেই এই তালিকায় এত উপরে।

ফাবিও কানাভারো।  ছবি: সংগৃহীত ৬. ফাবিও কানাভারো

আরেক ইতালিয়ান ফুটবলার। ২০০৬ বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক। সে বছর জিতেছেন ব্যালন ডি'অরও। সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে ধরা হয় ফাবিও কানাভারোকে। অথচ তিনি কখনও চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেননি। 

অথচ ইন্টার মিলান, জুভেন্টাস ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে খেলেছেন কানাভারো। বিশ্বকাপ জিতলেও চ্যাম্পিয়নস লিগের হাহাকার নিয়েই শেষ করতে হয় ক্যারিয়ার। 

এরিক ক্যান্টোনা।  ছবি: সংগৃহীত ৫. এরিক ক্যান্টোনা

গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পুণরুত্থান। কৃতিত্বটা কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনেরই বেশি। আর মাঠের ফুটবল বদলে যায় যে একটি দলবদলে, সেটি এরিক ক্যান্টোনার।

এই ফরাসি ফরোয়ার্ডকে লিডস থেকে ইউনাইটেড নিয়ে আসে ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে। ২৬ বছর পর সেবার ইংলিশ লিগ জেতে ‘রেড ডেভিলস’। ক্যান্টোনা যে পাঁচ মৌসুম ছিলেন ওল্ড ট্রাফোর্ডে, তার মধ্যে চারবারই লিগ জেতে দলটি। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেননি। ১৯৯৭ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে অবসরের ঘোষণা দেন ক্যান্টোনা। এর দু’বছর পর ইউনাইটেডের সেই ত্রিমুকুট জয়ের মৌসুম; চ্যাম্পিয়নস লিগসহ। 

জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ।  ছবি: সংগৃহীত ৪. জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ

আয়াক্স, জুভেন্টাস, ইন্টার মিলান, বার্সেলোনা, এসি মিলান, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, পিএসজি – ইউরোপের বড় বড় কত ক্লাবেই খেলেছেন জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ। সাফল্যও বিস্তর। শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগটাই জেতা হয়নি কখনও। 

বয়স এখন ৪১ বছর। খেলছেন এখনও। তাঁর ক্লাব এসি মিলান এখনও টিকে আছে চ্যাম্পিয়নস লিগে। তবে টুর্নামেন্টে মিলানের স্কোয়াডে রাখা হয়নি ইব্রাহিমোভিচকে। চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাটা তাই বুঝি আর হল না!

ডেনিস বার্গক্যাম্প।  ছবি: সংগৃহীত ৩. ডেনিস বার্গক্যাম্প

ফুটবল পায়ে যেন শিল্পী ছিলেন ডেনিস বার্গক্যাম্প। এই ডাচ প্লে-মেকারের ছোঁয়ায় কত কত ম্যাচ জিতেছে আর্সেনাল। শিরোপাও। ইংলিশ লিগ জিতেছেন তিনি তিনবার। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগটা অধরাই থেকে গেছে।

পেশাদার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছিলেন বার্গক্যাম্প। সেবার চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠে তাঁর দল আর্সেনাল। তবে সেখানে হেরে যায় বার্সেলোনার কাছে। ফাইনালে বদলি খেলোয়াড়ের বেঞ্চ থেকে মাঠে নামা হয়নি বার্গক্যাম্পের।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আয়াক্স ও ইন্টার মিলানের জার্সিতে উয়েফা কাপ জিতেছিলেন বার্গক্যাম্প। ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের খুব কাছ থেকেও হতাশ হতে হয়েছে এই ডাচ কিংবদন্তিকে। 

জিয়ানলুইজি বুফ্ফন২. জিয়ানলুইজি বুফ্ফন

প্রজন্মের তো বটেই, সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক তিনি। বিশ্বকাপসহ জিতেছেন সম্ভাব্য প্রায় সব শিরোপা। চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও তো উঠেছিলেন তিন-তিনবার। কিন্তু ওই ট্রফিটি জিততে পারেননি জিয়ানলুইজি বুফ্ফন। 

ক্যারিয়ারের বড় অংশ কাটিয়েছেন জুভেন্টাসে। ২০০৩ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে টাইব্রেকারে দুটি সেভও করেন বুফ্ফন। কিন্তু এসি মিলানের ট্রফি জয় থামাতে পারেননি। যেমনটা ফাইনালে হার ঠেকাতে পারেননি ২০১৫ সালে বার্সেলোনা ও ২০১৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে।  

চ্যাম্পিয়নস লিগটা তাই বুফ্ফনের কাছে হতাশার প্রতিশব্দ।

রোনালদো।  ছবি: সংগৃহীত ১. রোনালদো

রোনালদো কখনও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতেননি! এটা জানার পরও আবার রেকর্ডবই দেখে আপনার নিশ্চিত হতে হবে। সত্যিই রোনালদো কখনও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতেননি।

না, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কথা বলা হচ্ছে না। তিনি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন পাঁচ-পাঁচবার। কিন্তু একই নামের ব্রাজিলিয়ান পূর্বসূরী রোনালদো এ ট্রফিটি জিততে পারেননি। 

অথচ সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার তিনি। ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য দু’বার। ফিফা বর্ষসেরার পুরস্কার জিতেছেন তিনবার; ব্যালন ডি’অর দুবার। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন রোনালদো। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। ক্লাব ফুটবলে খেলেছেন বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, ইন্টার মিলান, এসি মিলানের মতো পরাশক্তি সব ক্লাবে। মহাদেশীয় প্রতিযোগিতায় উয়েফা কাপ, উয়েফা কাপ উইনার্স কাপ, ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জিতেছেন। 

কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগটা চিরকালই রোনালদোর দীর্ঘশ্বাস হয়ে থেকেছে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডের সেই অত্যাশ্চর্য হ্যাটট্রিক সত্ত্বেও।

চ্যাম্পিয়নস লিগ না জেতা সর্বকালের সেরা ফুটবলার তাই এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদোই।

 

মন্তব্য করুন: